
ডাঃ মোঃ নাজমুল আহসান,স্টাফ রিপোর্টার:
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর গ্রামের ইতিহাসে এক প্রেরণার নাম—মাজেদা খানম ডালিম। শত প্রতিকূলতা, বিদ্যুৎহীন অন্ধকার গ্রাম, অশিক্ষিত সমাজ—সব কিছুকে জয় করে তিনি আট সন্তানের জীবন গড়েছেন আলোয়। তাঁর জীবনী শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি মা, ত্যাগ ও শিক্ষার মহান প্রতীক।
অশিক্ষিত হয়েও শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন ডালিম
পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা। তারপর দাদির আপত্তি।
কিন্তু শেখার প্রতি অপরিসীম আগ্রহই তাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে—
“আমার সব সন্তানকে বিএ পর্যন্ত পড়াবো।”
সেই প্রতিজ্ঞা আজ বাস্তব এবং গৌরবময়।
মানবসেবার প্রতীক ডাক্তার মনসুর আলী গাজী
১৯৬০ সালে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কোর্স শেষ করে সরকারি চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু গ্রামে মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখে পিতার নির্দেশেই চাকরি ছেড়ে দেন—মানুষের সেবায়।
গ্রাম-সংলগ্ন দুর্গম এলাকায় সাইকেল ও নৌকায় ঘুরে চিকিৎসা দেওয়া ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।
ডাক্তারি রেজিস্ট্রেশন পেতে
১৯৬১–১৯৮০ পর্যন্ত ১৯ বছর মামলা চালিয়ে
শেষ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১২৯৯ লাভ করেন—এক ইতিহাস।
অন্ধকার গ্রামের আলোকবর্তিকা ছিলেন ডালিম
বিদ্যুৎবিহীন লস্কর গ্রামে হারিকেনের আলোয় সন্তানদের পড়াতেন।
নিয়ম ছিল কঠোর—
মাগরিবের আজানের আগে সবাইকে বাড়ির ভেতর
নামাজের পর পড়াশোনা
রাত ৩টায় ডাক দিয়ে আবার পড়তে বসানো
শিশুদের ভূতের ভয় দূর করতে ভোর পর্যন্ত কোরআন তিলাওয়াত
সময়মতো খাবার, টিফিন ও শৃঙ্খলা—সব নিজ হাতে
আট সন্তানের আটটি উজ্জ্বল অর্জন
পরিশ্রমী এই দম্পতির আট সন্তান আজ দেশের-বিদেশের সম্মানিত স্থানে—
কহিনুর খানম – এনজিও কর্মকর্তা (অব.)
ড. মাহবুবুর রহমান – আইনশাস্ত্রে পিএইচডি, বিদেশে শিক্ষক
ড. মেহেদী মাসুদ – কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি, সফল আইটি বিশেষজ্ঞ
মোস্তাক আহমেদ – প্রধান শিক্ষক, লস্কর হাই স্কুল
মেরি খানম – গণিতে এমফিল, কলেজের সহকারী অধ্যাপক
অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল – লন্ডন থেকে এলএলএম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী
ডা. মেহেদী হাসান – চক্ষু বিশেষজ্ঞ
মলি খানম – মাস্টার্স, বর্তমানে জাপান প্রবাসী
মানবিকতা ছিল ডালিমের পরিচয়
ডাক্তার মনসুর আলীর রোগীরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করলে—
ডালিম তাঁদের জন্য খাবার, বিশ্রাম ও গোসলের ব্যবস্থাও করতেন।
নিজেদের কষ্ট ভুলে মানুষের কষ্ট ভাগ করে নিতেন।
সাহিত্য ও রেডিও সংস্কৃতির প্রেমে ছিলেন তিনি
নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে বেগম রোকেয়া—
ডালিম পড়েছেন অসংখ্য সাহিত্যকর্ম।
রেডিও নাটক ছিল তার রাতের সঙ্গী।
শেষ কথা
লস্কর গ্রামের সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা—
এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, একটি যুগের গল্প।
মাজেদা খানম ডালিম প্রমাণ করেছেন—
একজন শিক্ষিত মা পুরো সমাজকে বদলে দিতে পারেন।